আহা, আজকালকার ছেলেমেয়েদের কী দশা বলুন তো! সারাদিন ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে, মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে তাদের বেড়ে ওঠা। আমার তো মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হয় দেখে!
মনে হয়, আমরা যে খোলা হাওয়ায় ছোটাছুটি করে, মাঠে-ঘাটে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে শিখেছি, সেই আনন্দটা বুঝি ওরা আর পাচ্ছে না। অথচ জানেন, সারা বিশ্বজুড়ে এখন শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাইরে প্রকৃতির কোলে শেখার মজাই আলাদা। এতে নাকি মন আর শরীর দুটোই দারুণ সতেজ থাকে, পড়াশোনাতেও মন বসে দ্বিগুণ। অভিজ্ঞতা বলে, খোলা পরিবেশে শিখলে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, জীবনকেও কাছ থেকে চিনতে পারা যায়। এই যে নতুন প্রজন্মের জন্য একটা নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে, এটা আমার কাছে দারুণ এক পরিবর্তনের বার্তা। আমি তো মনে করি, এই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগানো উচিত!
তাহলে চলুন, এই নতুন ধারার ‘আউটডোর লার্নিং’ বা বহিরঙ্গন শিক্ষা আসলে কী, আর কীভাবে এর মাধ্যমে আমাদের সন্তানেরা আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত জেনে নিই।
প্রকৃতির ডাকে সাড়া: কেন আজ আমাদের শিশুদের বাইরে পাঠানো জরুরি?

সত্যি বলতে কি, আজকালকার বাচ্চারা প্রকৃতির সাথে একরকম সংযোগ হারিয়েই ফেলছে। আমার তো মনে হয়, এর ফলে ওদের শুধু শরীরই নয়, মনও কেমন যেন ঘরের কোণে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন স্কুল ছুটির পর মাঠে ছোটাছুটি করতাম, পুকুরে ডুব দিতাম, গাছের ডালে চড়ে বসতাম – এই সবকিছুই ছিল আমাদের শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাটি, জল, গাছপালা আর আকাশের অসীমতা আমাদের শেখাত জীবনের অনেক বড় বড় পাঠ, যা কোনো বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। কিন্তু এখনকার শিশুরা এই সুযোগটা খুব একটা পায় না। এই যে চারপাশে চার দেওয়ালের বন্দিদশা, মোবাইল আর ল্যাপটপের দুনিয়ায় ডুবে থাকা, এটা আমাকে ভীষণ ভাবায়। আমার মনে হয়, প্রকৃতির কোলে যে উদারতা, যে বৈচিত্র্য, তা শিশুদের মনে অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করে। যখন একটা শিশু খোলা পরিবেশে দৌড়ায়, গাছ স্পর্শ করে, পাখির গান শোনে, তখন তার পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়, যা মস্তিষ্কের বিকাশে দারুণ সাহায্য করে। ঘরে বসে শেখাটা একরকম একঘেয়েমি এনে দেয়, যেখানে প্রকৃতির উন্মুক্ত পাঠশালা যেন নতুন নতুন রহস্য উন্মোচন করে শেখার প্রক্রিয়াকে করে তোলে আরও আনন্দময় এবং ফলপ্রসূ। আমি নিজে দেখেছি, যেসব বাচ্চারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে বড় হয়, তাদের মধ্যে কৌতূহল এবং শেখার আগ্রহ অনেক বেশি থাকে। তাই আমাদের এখন গভীরভাবে ভাবা উচিত, কীভাবে এই ডিজিটাল দুনিয়া থেকে তাদের বের করে প্রকৃতির খোলা পরিবেশে ফিরিয়ে আনা যায়, যাতে তারা সত্যিকারের আনন্দের সাথে শিখতে পারে।
কেন শিশুরা প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে, কিন্তু এর একটা অন্য দিকও আছে। আমাদের সন্তানেরা এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার স্ক্রিনে আটকে থাকছে। গেম খেলা, কার্টুন দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা—এই সব কিছুর প্রতি তাদের আকর্ষণ এত বেশি যে, বাইরের জগতের প্রতি তাদের আর তেমন টান থাকে না। তাছাড়া, শহরের জীবনযাত্রাও এর জন্য কম দায়ী নয়। খেলার মাঠের অভাব, পার্ক বা খোলামেলা জায়গার স্বল্পতা, নিরাপত্তার ভয়—এগুলোও শিশুদের ঘরের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করে। বাবা-মায়েদের কর্মব্যস্ততাও একটা বড় কারণ। অনেক সময় চাইলেও তারা তাদের সন্তানদের সময় দিতে পারেন না বা বাইরে নিয়ে যেতে পারেন না। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই পরিস্থিতির কারণে শিশুরা প্রকৃতির সাথে সেই নিবিড় সম্পর্কটা গড়ে তুলতে পারছে না, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রকৃতির সান্নিধ্য শেখার প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
প্রকৃতির সান্নিধ্য যে শেখার প্রক্রিয়াকে কতটা সমৃদ্ধ করতে পারে, তা হয়তো আমরা অনেকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করি না। যখন একটি শিশু একটি গাছের পাতা স্পর্শ করে তার গঠন শেখে, অথবা একটি পিঁপড়ার চলার পথ অনুসরণ করে তার শৃঙ্খলা দেখে, তখন সে হাতে-কলমে শিখছে। এটি কেবল স্মৃতিশক্তি বাড়ায় না, বরং শেখার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি করে। কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বইয়ের পাতায় পড়ে শেখার চেয়ে যদি সে নিজেই নদীর ধারে গিয়ে মাটির চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে তার শেখাটা আরও বাস্তবসম্মত হয়। আমার কাছে মনে হয়, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই একজন শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। সূর্যের আলো, বৃষ্টির শব্দ, পাখির কিচিরমিচির—এগুলো শুধু মনকে শান্ত করে না, নতুন কিছু শেখার আগ্রহও তৈরি করে। শিশুরা যখন দলবদ্ধভাবে বাইরে কাজ করে, তখন তারা দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং সমস্যা সমাধানের মতো সামাজিক দক্ষতাও অর্জন করে। এটি তাদের শেখার আগ্রহ বাড়ায় এবং তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যে প্রকৃতির অবদান
আমি তো মনে করি, আমাদের জীবনে প্রকৃতির অবদান অসীম, বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। আজকালকার বাচ্চাদের মধ্যে যে স্থূলতা বা চোখের সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তার একটা বড় কারণ হলো ঘরের মধ্যে আটকে থাকা। কিন্তু যখন তারা বাইরে যায়, দৌড়ঝাঁপ করে, খেলে, তখন তাদের শরীর সচল থাকে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি পায়, যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, যেসব শিশু নিয়মিত বাইরে খেলাধুলা করে, তাদের সর্দি-কাশি বা অন্যান্য ছোটখাটো অসুখ কম হয়। শুধু শরীর নয়, মনকেও ভালো রাখতে প্রকৃতির জুড়ি নেই। সবুজ গাছপালা, পাখির গান, খোলা আকাশের নিচে শান্ত পরিবেশ আমাদের মনকে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়। আমার মনে আছে, আমার ছোটবেলায় যখন কোনো কারণে মন খারাপ হতো, তখন মা বলতেন, “যা, বাইরে গিয়ে একটু ঘুরে আয়।” আর সত্যি বলতে কি, মিনিট কয়েকের মধ্যেই মনটা অনেকটাই হালকা হয়ে যেত। আধুনিক গবেষণাও বলছে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে মানসিক চাপ কমে, অস্থিরতা দূর হয়, আর মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ে। তাই, শিশুদের সুস্থ সবল করে তুলতে এবং তাদের মানসিক বিকাশে প্রকৃতির সাথে সময় কাটানোর গুরুত্ব অপরিসীম, যা আমরা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারি না।
শারীরিক কার্যকলাপ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
প্রকৃতির কোলে সময় কাটানো মানেই হলো শারীরিক কার্যকলাপের এক দারুণ সুযোগ। যখন শিশুরা পার্কে দৌড়ায়, গাছে চড়ে বা কাদা মাটির সাথে খেলা করে, তখন তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সচল থাকে। এই শারীরিক পরিশ্রম তাদের পেশী ও হাড়কে শক্তিশালী করে তোলে। তাছাড়া, বাইরের পরিবেশে থাকা বিভিন্ন জীবাণুর সাথে তাদের শরীর পরিচিত হয়, যা ধীরে ধীরে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। আমি দেখেছি, যে শিশুরা নিয়মিত বাইরে খেলাধুলা করে, তারা ঘরের মধ্যে থাকা শিশুদের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ থাকে এবং কম অসুস্থ হয়। এটি তাদের হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ভালো ঘুমের জন্যও সহায়ক। তাই, সুষম খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি, বাইরের খোলা বাতাসে শারীরিক কার্যকলাপ শিশুদের সার্বিক শারীরিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
মানসিক চাপ কমাতে ও একাগ্রতা বাড়াতে প্রকৃতির ভূমিকা
শহরের ব্যস্ত জীবন, স্কুলের পড়াশোনার চাপ, আর প্রযুক্তির বাড়তি ব্যবহার শিশুদের মধ্যেও মানসিক চাপ তৈরি করছে। আমার তো মনে হয়, প্রকৃতির নীরব সান্নিধ্য এই চাপ কমানোর এক দারুণ দাওয়াই। যখন একটি শিশু একটি শান্ত পার্ক বা বাগানে বসে থাকে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে, তখন তার মন শান্ত হয়। সবুজ রং চোখের জন্য আরামদায়ক, আর পাখির কিচিরমিচির মনকে শান্তি দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির কাছে সময় কাটালে শিশুদের মধ্যে অস্থিরতা কমে এবং মনোযোগ বাড়ে। তারা আরও সৃজনশীল এবং ইতিবাচক হয়ে ওঠে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটালে শিশুদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং তারা পড়ালেখায় আরও বেশি মনোযোগী হতে পারে। এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক ধরনের টনিকের মতো কাজ করে, যা তাদের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করে।
সৃজনশীলতা আর সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি: বহিরঙ্গন শিক্ষা
সত্যি কথা বলতে কি, আমার তো মনে হয়, প্রকৃতির কোলে যে শিক্ষাটা পাওয়া যায়, তা আমাদের সৃজনশীলতা আর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে দারুণভাবে বাড়িয়ে তোলে। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আমরা যা শিখি, তা একরকম বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে হয়। কিন্তু বাইরে খোলা পরিবেশে কোনো সীমা থাকে না। একটা গাছের পাতা কেন সবুজ, একটা পাখি কীভাবে বাসা বানায়, অথবা বৃষ্টির জল কোনদিকে গড়িয়ে যায়—এইসব ছোট ছোট প্রশ্নগুলো শিশুদের মনে কৌতূহল জাগায়। আর এই কৌতূহলই তাদের গবেষণার দিকে ঠেলে দেয়, নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য উৎসাহিত করে। আমি নিজে দেখেছি, যখন শিশুরা প্রকৃতির মধ্যে কোনো অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হয়, যেমন হয়তো গাছের ডাল দিয়ে একটা সেতু বানাতে গিয়ে বা কোনো জিনিস খুঁজে বের করতে গিয়ে, তখন তারা নিজেদের মতো করে সমাধান বের করার চেষ্টা করে। এটি তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি করে। ক্লাসরুমে হয়তো শিক্ষক একটা সমস্যার সমাধান বলে দেন, কিন্তু প্রকৃতির পাঠশালায় শিশুকেই তার নিজস্ব পথে সমাধানের রাস্তা খুঁজে বের করতে হয়। এই প্রক্রিয়া তাদের কল্পনাশক্তিকে আরও বেশি গতি দেয়, কারণ তাদের হাতে কোনো রেডিমেড উত্তর থাকে না। তারা নিজেদের চারপাশে থাকা উপকরণ দিয়েই নতুন কিছু তৈরি করতে শেঁখে, নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করে। আমার মনে হয়, এই ধরনের শিক্ষাই একজন শিশুকে ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুত করে তোলে, কারণ জীবনে সব সময় নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, আর সেগুলোর জন্য আমাদের দরকার হয় সৃজনশীল এবং অভিনব সমাধান।
খোলা পরিবেশে আবিষ্কারের আনন্দ
যখন একটি শিশু খোলা পরিবেশে পা রাখে, তখন তার সামনে খুলে যায় এক বিশাল আবিষ্কারের জগৎ। সে হয়তো একটা ছোট পোকা দেখে তার জীবনচক্র সম্পর্কে প্রশ্ন করে, একটা ফুল দেখে তার রং আর গন্ধ নিয়ে চিন্তা করে, অথবা পাথর কুড়িয়ে নতুন কিছু বানানোর চেষ্টা করে। এই যে নিজের চোখে দেখা, হাতে ধরে অনুভব করা, আর প্রশ্ন করা – এই প্রক্রিয়াটা তাদের মধ্যে শেখার প্রতি এক ধরনের প্রবল আগ্রহ তৈরি করে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে, যা তারা সহজে ভোলে না। ক্লাসরুমে যা শুধুই তথ্য, বাইরে তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত পাঠ। এই আবিষ্কারের আনন্দ তাদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগায় এবং নতুন কিছু শেখার প্রতি তাদের উৎসাহ বাড়ায়।
বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন
প্রকৃতির পরিবেশে শিশুরা প্রায়শই এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যেখানে তাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় বা কোনো সমস্যার সমাধান করতে হয়। যেমন, হয়তো তারা নদীর ধারে একটি বাঁধ তৈরি করার চেষ্টা করছে, বা গাছের ডাল ব্যবহার করে একটি আশ্রয়স্থল বানাচ্ছে। এই ধরনের কাজগুলো তাদের মধ্যে ব্যবহারিক বুদ্ধিমত্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করে। তারা দলগতভাবে কাজ করতে শেখে, একে অপরের সাথে সহযোগিতা করতে শেখে, যা তাদের সামাজিক দক্ষতার বিকাশেও সহায়তা করে। আমি দেখেছি, এই ধরনের শিশুরা পরবর্তীতে স্কুলের পড়ালেখায়ও আরও বেশি স্বাবলম্বী হয়, কারণ তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে তোলে।
শুধু বই নয়, জীবন থেকেও শেখা: আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের স্কুল ছুটির পর পরই বাড়ির কাছে এক বিশাল মাঠে চলে যেতাম। সেখানে ছিল বড় বড় গাছ, একটা পুকুর, আর চারদিকে সবুজ ঘাস। আমার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আমরা সারা বিকেল খেলাধুলা করতাম। কখনও গাছে চড়ে আম পাড়তাম, কখনও পুকুরে ডুব দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করতাম, আবার কখনও শুকনো পাতা আর ডালপালা দিয়ে নিজেদের জন্য একটা ছোট্ট ঘর বানাতাম। তখন তো আর স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের এত বাড়াবাড়ি ছিল না, তাই প্রকৃতির সাথেই ছিল আমাদের যত সখ্যতা। আমার মনে আছে, একবার আমরা একটা ছোট পাখির বাসা খুঁজে পেয়েছিলাম, আর সেটার মধ্যে ডিম দেখে কী যে আনন্দ হয়েছিল! সেই ডিমগুলো থেকে কীভাবে ছোট ছোট বাচ্চা বেরিয়ে এলো, সেটা আমাদের চোখে দেখা ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা। স্কুলের বইয়ে আমরা পাখির জীবনচক্র পড়তাম, কিন্তু বাস্তবে সেটা দেখে শেখাটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবন কতটা বৈচিত্র্যময় এবং প্রকৃতির প্রতিটি কোণায় লুকানো আছে কত অজানা রহস্য। আমার কাছে মনে হয়, ওই দিনগুলোর শিক্ষাই আমাকে পরবর্তীতে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। প্রকৃতি আমাকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে, প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন পথ খুঁজে বের করতে শিখিয়েছে। আমার নিজের সন্তানের ক্ষেত্রেও আমি একই জিনিস লক্ষ্য করেছি। যখন সে খোলা পরিবেশে যায়, তখন সে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত হয়, তার চোখ দুটি যেন আরও উজ্জ্বল দেখায়, আর তার মুখে লেগে থাকে এক অদ্ভুত আনন্দ। এই আনন্দই হলো সত্যিকারের শেখার মূলমন্ত্র, যা বইয়ের পাতার বাইরে থেকেই আসে।
এখানে বহিরঙ্গন শিক্ষার কিছু মূল সুবিধা এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার সাথে এর পার্থক্য একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | বহিরঙ্গন শিক্ষা | ঐতিহ্যবাহী শ্রেণীকক্ষ শিক্ষা |
|---|---|---|
| শিক্ষার পরিবেশ | খোলা প্রকৃতি, মাঠ, বন, বাগান | চার দেওয়ালের মধ্যে শ্রেণীকক্ষ |
| শেখার পদ্ধতি | হাতে-কলমে, অভিজ্ঞতাভিত্তিক, আবিষ্কারমূলক | বইভিত্তিক, শিক্ষক-কেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর |
| শারীরিক কার্যকলাপ | উচ্চ, দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা, অন্বেষণ | কম, বেশিরভাগ সময় বসে থাকা |
| সৃজনশীলতা | উচ্চ, নতুনত্ব ও উদ্ভাবনে উৎসাহ | সীমিত, নির্দিষ্ট নিয়ম ও কাঠামো অনুসরণ |
| সামাজিক দক্ষতা | উচ্চ, দলগত কাজ ও সহযোগিতা | মাঝারি, ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রবণতা |
| মানসিক স্বাস্থ্য | উন্নত, মানসিক চাপ হ্রাস, মনোযোগ বৃদ্ধি | মাঝারি, চাপ ও অস্থিরতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা |
ঘরে বসেই যদি শিখি, তবে প্রকৃতির কাছে কী শিখব?
এই প্রশ্নটা প্রায়ই আমাকে অনেকে করেন, “সব তো ঘরে বসেই ইন্টারনেটে শেখা যায়, তাহলে আর বাইরে গিয়ে কী লাভ?” আমার মনে হয়, যারা এই প্রশ্ন করেন, তারা হয়তো প্রকৃতির আসল শক্তিটা পুরোপুরি বোঝেন না। হ্যাঁ, ইন্টারনেটে আমরা অনেক তথ্য পাই, অনেক কিছু দেখতে পাই, কিন্তু প্রকৃত অভিজ্ঞতাটা কি আর পাওয়া যায়? যেমন ধরুন, আপনি হয়তো অনলাইনে একটা নদীর ছবি দেখলেন বা একটা ভিডিও দেখলেন, যেখানে জল বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই নদীর ধারে গিয়ে তার ঠান্ডা বাতাস গায়ে মাখা, জলের শব্দ শোনা, অথবা স্রোতের টান অনুভব করা—এই অনুভূতিগুলো কি আর ভার্চুয়াল জগতে পাওয়া সম্ভব? আমার তো মনে হয়, ঘরে বসে শেখাটা অনেকটা শুকনো খাবার খাওয়ার মতো, যেখানে সব পুষ্টি থাকলেও স্বাদ বা তৃপ্তিটা অনুপস্থিত। প্রকৃতি আমাদের কেবল তথ্য দেয় না, এটি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে তোলে, আমাদের আবেগগুলোকে প্রভাবিত করে। যখন একটি শিশু একটি পিঁপড়াকে তার খাদ্য সংগ্রহ করতে দেখে, তখন সে কেবল একটি বৈজ্ঞানিক তথ্যই শেখে না, বরং প্রকৃতির অবিরাম কর্মতৎপরতা আর টিকে থাকার সংগ্রামটাকেও অনুভব করে। এই অনুভবগুলোই তাকে একজন সহানুভূতিশীল, পর্যবেক্ষণশীল এবং দূরদর্শী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, প্রকৃতির কাছে শেখাটা কেবল বইয়ের জ্ঞান অর্জন নয়, বরং জীবনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করা। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে আমাদের চারপাশের পৃথিবীর সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হয়, কীভাবে নিজেকে বৃহত্তর মহাজাগতিক ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে দেখতে হয়। আর এই শিক্ষা, আমার মতে, যেকোনো ডিজিটাল জ্ঞানের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া

প্রযুক্তি আমাদের অগণিত তথ্য এনে দিতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিতে পারে না। একটি শিশু যখন একটি প্রজাপতিকে নিজের হাতে স্পর্শ করে বা একটি গাছ লাগানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তখন তার যে শেখা হয়, তা কেবল তথ্য নয়, বরং একটি গভীর সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা। অনলাইনে হয়তো সে শিখতে পারে কীভাবে একটি বীজ থেকে চারা হয়, কিন্তু মাটিতে হাত দিয়ে বীজ বপন করা, জল দেওয়া, আর চারা বড় হতে দেখার অভিজ্ঞতা তাকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল এবং যত্নশীল করে তোলে। আমার তো মনে হয়, এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোই শিশুদের মধ্যে সহানুভূতি এবং পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে, যা কোনো স্ক্রিনের সামনে বসে অর্জন করা সম্ভব নয়।
প্রকৃতির সাথে আত্মিক সংযোগ স্থাপন
আমার অভিজ্ঞতা বলে, প্রকৃতির সাথে শিশুদের এক ধরনের আত্মিক সংযোগ তৈরি হয়, যা তাদের মানসিক বিকাশে দারুণভাবে সাহায্য করে। যখন তারা খোলা আকাশে তারা দেখে, বা একটা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্য উপভোগ করে, তখন তাদের মনে এক বিশালতার অনুভূতি আসে। এটি তাদের মনকে প্রসারিত করে এবং ছোট ছোট সমস্যাগুলোকে বড় করে না দেখার শিক্ষা দেয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের মনের গভীরে ডুব দিতে শেখে, নিজেদের আবেগগুলোকে বুঝতে শেখে। এটি তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্থিতিশীলতা তৈরি করে, যা আধুনিক জীবনের চাপ মোকাবিলায় অত্যন্ত জরুরি। এই আত্মিক সংযোগ তাদের জীবনে এক ধরনের গভীর অর্থ যোগ করে, যা তারা অন্য কোনো মাধ্যমে পায় না।
বহিরঙ্গন শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান
আমি জানি, বহিরঙ্গন শিক্ষার কথা বললেই অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন আসে, অনেক চ্যালেঞ্জের কথা মনে পড়ে। সত্যি বলতে কি, আমাদের সমাজে এখন অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা শিশুদের বাইরে গিয়ে শেখার সুযোগকে সীমিত করে তোলে। শহরের জীবনে খোলা মাঠের অভাব, পার্ক বা বাগানের অপ্রতুলতা একটা বড় সমস্যা। তাছাড়া, বাবা-মায়েদের কর্মব্যস্ততাও একটা কারণ, কারণ তাদের পক্ষে সব সময় বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া বা তাদের সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব হয় না। নিরাপত্তার বিষয়টিও একটা বড় চিন্তার কারণ, কারণ অনেক বাবা-মা সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে ভয় পান। পরিবেশ দূষণ বা আবহাওয়ার প্রতিকূলতাও অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে বের করাটা খুব কঠিন কিছু নয়, যদি আমরা একটু সচেতন হই আর সদিচ্ছা থাকে। যেমন, শহরের ছোট ছোট পার্কগুলোকে আরও বেশি শিশুদের উপযোগী করে তোলা যায়। স্কুলগুলো তাদের পাঠ্যক্রমের বাইরেও মাঝে মাঝে প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত ফিল্ড ট্রিপ বা আউটডোর ক্লাস আয়োজন করতে পারে। কমিউনিটি বা পাড়ার পর্যায়ে কিছু সংগঠন তৈরি হতে পারে, যারা শিশুদের জন্য নিয়মিত বহিরঙ্গন কার্যকলাপের আয়োজন করবে। নিরাপত্তার জন্য হয়তো পাড়ার কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ বা স্বেচ্ছাসেবীরা শিশুদের সাথে থাকতে পারেন। আমার তো মনে হয়, সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো যদি একসাথে কাজ করে, তাহলে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ, শিশুদের ভবিষ্যৎ সুস্থ এবং সুন্দর জীবন গড়ার জন্য এই বহিরঙ্গন শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, আর এই গুরুত্বটা আমাদের সবারই উপলব্ধি করা উচিত।
সময় ও সুযোগের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ পরিবারেই বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত থাকেন, ফলে শিশুদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে আমরা কিছু ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে পারি। যেমন, ছুটির দিনে পরিবারের সবাই মিলে কোনো পার্ক বা প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া, অথবা সন্ধ্যায় বাড়ির কাছের ছোট কোনো বাগানে শিশুদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটানো। স্কুলগুলো তাদের সিলেবাসের বাইরেও “প্রকৃতির ক্লাস” বা “আউটডোর ডে” আয়োজন করতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, যদি একটু পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে এই ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুদের প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করতে হয় না। তাছাড়া, বাড়ির আশেপাশে যদি কোনো খেলার মাঠ বা পার্ক থাকে, সেখানে শিশুদের খেলতে উৎসাহিত করা যেতে পারে, তবে অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়
শিশুদের বাইরে পাঠাতে গেলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে বাবা-মায়েদের মনে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। এই উদ্বেগ দূর করতে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারি। প্রথমত, শিশুদের খেলাধুলার জন্য নিরাপদ স্থান নির্বাচন করা উচিত, যেখানে যানবাহন বা অন্যান্য বিপদ কম থাকে। দ্বিতীয়ত, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্র্যাফিক নিয়মাবলী এবং অপরিচিতদের থেকে দূরে থাকার বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। আমার মতে, সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানে শিশুরা বাইরে খেলাধুলা করে। কমিউনিটি পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক বা অভিভাবকদের একটি দল গঠন করা যেতে পারে, যারা পালা করে শিশুদের বাইরের কার্যক্রমে নজরদারি করবে। তাছাড়া, আজকাল অনেক সুরক্ষিত পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি হচ্ছে, যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিরাপত্তা কর্মীরা থাকেন। এই ধরনের স্থানগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবেশ সম্পর্কেও শিশুদের সচেতন করতে হবে, যেমন—কোন গাছের ফল খাওয়া যাবে না বা কোন পোকা থেকে দূরে থাকতে হবে।
ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় বহিরঙ্গন শিক্ষার অপরিহার্যতা
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় বহিরঙ্গন শিক্ষা এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে। আমাদের এখনকার শিক্ষাপদ্ধতি মূলত শ্রেণীকক্ষ-কেন্দ্রিক, যা অনেক সময় শিশুদের একঘেয়েমি আর মুখস্থবিদ্যার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু একুশ শতকে টিকে থাকার জন্য আমাদের এমন শিক্ষার্থী দরকার যারা কেবল তথ্য মুখস্থ করবে না, বরং সমস্যার সমাধান করতে পারবে, নতুন কিছু তৈরি করতে পারবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে। আর এই গুণগুলো বিকাশের জন্য প্রকৃতির কোলে শেখার কোনো বিকল্প নেই। আমার তো মনে হয়, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু বই আর খাতা থাকবে না, থাকবে মাঠ, বন, নদী আর সমুদ্রও। শিশুরা তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবেই প্রকৃতির সাথে সময় কাটাবে, হাতে-কলমে শিখবে, আর নিজেদের চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এটি তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করবে, যা আজকের পৃথিবীতে অত্যন্ত জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আমাদের এমন প্রজন্ম দরকার যারা প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল এবং দায়িত্বশীল। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, যে শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে, তারা অনেক বেশি সহানুভূতিশীল হয়, অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে এবং তারা নিজেদের সমাজের প্রতিও বেশি দায়িত্বশীল হয়। তাই, শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদরাও এখন বহিরঙ্গন শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই পদ্ধতি শিশুদের জন্য শেখার প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দময় করে তোলে এবং তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করে। আমার কাছে মনে হয়, এটি শুধু একটি শিক্ষাপদ্ধতি নয়, বরং একটি জীবন দর্শন, যা আমাদের সন্তানদের আরও উন্নত এবং অর্থবহ জীবন গড়তে সাহায্য করবে।
বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন
সারা বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিশাল পরিবর্তন আসছে। শিক্ষাবিদরা এখন বুঝতে পারছেন যে, শুধু শ্রেণীকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকা পড়ে শেখাটা আর যথেষ্ট নয়। আমার তো মনে হয়, শিশুরা যখন প্রকৃতির কোলে শেখে, তখন তাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক গভীর কৌতূহল তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করে, যা নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্ম দেয়। অনেক উন্নত দেশ, যেমন ফিনল্যান্ড বা জার্মানির মতো দেশগুলো তাদের পাঠ্যক্রমে বহিরঙ্গন শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করছে, কারণ তারা জানে যে, এটি শিশুদের সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে আমাদের দেশও এই ধারা অনুসরণ করবে এবং বহিরঙ্গন শিক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।
একুশ শতকের দক্ষতা অর্জনে এর গুরুত্ব
একুশ শতকে টিকে থাকার জন্য আমাদের কিছু নির্দিষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন, যেমন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগ এবং সহযোগিতা। আমার অভিজ্ঞতা বলে, বহিরঙ্গন শিক্ষা এই দক্ষতাগুলো বিকাশে দারুণভাবে সাহায্য করে। যখন শিশুরা প্রকৃতির মধ্যে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন তাদের নিজেদের মতো করে সমাধান খুঁজে বের করতে হয়, যা তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা তৈরি করে। দলগতভাবে কাজ করার মাধ্যমে তারা সহযোগিতা এবং যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করে। তাছাড়া, খোলা পরিবেশে তারা নতুন নতুন খেলা তৈরি করে, যা তাদের সৃজনশীলতা বাড়ায়। এই দক্ষতাগুলো কেবল শিক্ষাজীবনে নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, বহিরঙ্গন শিক্ষা আমাদের সন্তানদেরকে ভবিষ্যতের জন্য সত্যিকারের প্রস্তুত করে তুলবে, যা অন্য কোনো শিক্ষাপদ্ধতি হয়তো পুরোপুরি দিতে পারে না।
글을마চি며
আমাদের শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতির সাথে তাদের সংযোগ কতটা জরুরি, তা আমরা আলোচনা করলাম। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে ও শিখতে প্রকৃতির উদারতাই শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলে, যখন শিশুরা খোলা পরিবেশে হাসে, খেলে, নতুন কিছু আবিষ্কার করে, তখন তাদের ভেতরের সত্যিকারের মানুষটা বিকশিত হয়। এই যাত্রায় আমরা যদি তাদের হাত ধরে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে তারা কেবল একজন ভালো শিক্ষার্থী হবে না, বরং একজন সহানুভূতিশীল, পরিবেশপ্রেমী এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রকৃতির এই অমূল্য উপহারকে আমাদের শিশুদের কাছে ফিরিয়ে দিই।
알아두면 쓸মো 있는 정보
১. ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করুন: প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও শিশুকে বাড়ির পাশের পার্ক বা খোলা মাঠে নিয়ে যান। এমনকি বারান্দার টবে গাছ লাগানো বা ছাদে বসে তারা গোনাও এক দারুণ শুরু হতে পারে।
২. শেখাকে মজাদার করে তুলুন: প্রকৃতিতে শেখার সময় খেলাধুলাকে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলুন। পাতা সংগ্রহ করা, পাখির ছবি আঁকা বা মাটির দুর্গ তৈরি করা—এগুলো শিশুদের কাছে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলবে।
৩. আপনি নিজেও তাদের সাথে যোগ দিন: শিশুরা আপনাকে অনুসরণ করবে। আপনি যখন তাদের সাথে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাবেন, তখন তাদের উৎসাহ অনেক বেড়ে যাবে। এটা আপনার জন্যও মানসিক শান্তির উৎস হতে পারে।
৪. আবহাওয়াকে ভয় পাবেন না: হালকা বৃষ্টি বা ঠাণ্ডা আবহাওয়াও প্রকৃতির সাথে সময় কাটানোর পথে বাধা নয়। উপযুক্ত পোশাক পরে ছাতা বা রেইনকোট নিয়ে বের হলে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব।
৫. বিদ্যালয় ও সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করুন: আপনার সন্তানের বিদ্যালয়কে বহিরঙ্গন শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করুন। স্থানীয় কমিউনিটি গ্রুপগুলোর সাথে যোগ দিয়ে শিশুদের জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি কার্যক্রম আয়োজন করার চেষ্টা করুন।
중요 사항 정리
আমাদের আজকের আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্য অপরিহার্য। শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ ও সতেজ রাখতে প্রকৃতির অবদান অসামান্য। বাইরের উন্মুক্ত পরিবেশে খেলাধুলা করার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বাড়ে, তেমনি তাদের মানসিক চাপ কমে এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। আমি নিজে দেখেছি, প্রকৃতির মাঝে থাকা শিশুরা অনেক বেশি কৌতূহলী হয়, তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও অনেক বেশি বিকশিত হয়। বইয়ের পাতার বাইরে গিয়ে যখন তারা সরাসরি প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন তাদের শেখাটা আরও গভীর ও স্থায়ী হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমরা হয়তো অনেক তথ্য পাই, কিন্তু জীবনের আসল পাঠগুলো প্রকৃতির কাছেই মেলে। এটি শিশুদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা এবং আত্মিক সংযোগ তৈরি করে, যা তাদের মানবিক গুণাবলী বিকাশে সহায়ক। যদিও বহিরঙ্গন শিক্ষার পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেমন – স্থানের অভাব বা নিরাপত্তার উদ্বেগ, তবে আমাদের সদিচ্ছা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা জরুরি যারা শুধু জ্ঞানী নয়, বরং সহানুভূতিশীল, উদ্ভাবনী এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল। তাই, আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের শিশুদের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করি, তাদের হাতে ধরিয়ে দিই প্রকৃতির সবুজ ও উন্মুক্ত পাঠশালায় প্রবেশের চাবি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: আউটডোর লার্নিং বা বহিরঙ্গন শিক্ষা আসলে কী, এটা কি শুধু বাইরে খেলাধুলা করা?
উ: আরে বাবা, এই তো মূল প্রশ্ন! দেখুন, আউটডোর লার্নিং মানে কিন্তু কেবল মাঠে গিয়ে একটু দৌড়াদৌড়ি করা বা গাছের ডালে ওঠা নয়। এটা তার চেয়েও অনেক গভীর কিছু। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটা হলো প্রকৃতির সান্নিধ্যে, খোলা পরিবেশে পরিকল্পিতভাবে শেখার একটা পদ্ধতি। যখন আমরা বাচ্চাদেরকে একটা ক্লাসরুমের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে শেখাই, সেটাই আউটডোর লার্নিং। ধরুন, স্কুলের আঙিনায় একটা ছোট্ট সবজির বাগান তৈরি করে সেখানে ওরা মাটি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ নিয়ে সরাসরি কাজ করছে, এটা আউটডোর লার্নিং। আবার, কোনো পার্কে গিয়ে পাখির বাসা খুঁজছে বা বিভিন্ন গাছের পাতা সংগ্রহ করছে, সেগুলো নিয়ে ক্লাসে এসে আলোচনা করছে, এটাও কিন্তু এর অংশ। মূল কথা হলো, বাইরের পরিবেশটাকে একটা জীবন্ত ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, যা শুধু বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়। আমার তো মনে হয়, এতে ওদের কৌতূহল অনেক বাড়ে আর শেখার আগ্রহটাও অন্যরকম হয়।
প্র: শিশুদের জন্য বহিরঙ্গন শিক্ষার কী কী সুবিধা আছে? এটা কি শুধু ওদের শরীর ভালো রাখে?
উ: বাহ! দারুণ প্রশ্ন করেছেন! শুধু শরীর ভালো রাখা নয়, এর সুবিধাগুলো শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন!
আমার বহুদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, বাইরের পরিবেশে শিখলে শিশুদের সার্বিক বিকাশ ঘটে, যা কোনো ইনডোর পরিবেশ দিতে পারে না।
প্রথমত, শারীরিক সুবিধা তো আছেই। খোলা বাতাসে দৌড়ানো, লাফানো, গাছে চড়া বা হাঁটাহাঁটি করলে শিশুদের হাড় মজবুত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, আর শরীরও সতেজ থাকে। কম্পিউটার বা মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকলে এই সুযোগটা ওরা পায় না।
দ্বিতীয়ত, মানসিক বিকাশ। প্রকৃতিতে থাকলে শিশুদের মন অনেক শান্ত থাকে, ওদের ভেতরের চাপ কমে। প্রকৃতির রং, শব্দ আর গন্ধ ওদের মনকে সতেজ করে তোলে। আমি দেখেছি, যেসব বাচ্চারা বাইরে বেশি সময় কাটায়, তারা অনেক বেশি হাসিখুশি আর আত্মবিশ্বাসী হয়।
তৃতীয়ত, শেখার পদ্ধতিতেও আসে বিশাল পরিবর্তন। বাইরে ওরা হাতে-কলমে শেখে, যা বইয়ের পাতার জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। এতে ওদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা আর সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বাড়ে। একটা পাথর গড়িয়ে যাচ্ছে কেন, বা একটা গাছের পাতা অন্য পাতার থেকে আলাদা কেন—এইসব প্রশ্নের উত্তর ওরা নিজেরাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যা ওদের জ্ঞানকে স্থায়ী করে।
চতুর্থত, পরিবেশ সচেতনতা। যখন ওরা সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে কাজ করে, তখন ওদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি একটা মায়া জন্মায়, যা ভবিষ্যতে ওদেরকে পরিবেশপ্রেমী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আমার মনে হয়, প্রকৃতির প্রতি এই ভালোবাসাটা এখনকার প্রজন্মের জন্য ভীষণ জরুরি।
প্র: কীভাবে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বা স্কুল-বাড়িতে বহিরঙ্গন শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি? এর জন্য কি বিশেষ কোনো সরঞ্জামের দরকার?
উ: আরে না, না, বিশেষ সরঞ্জামের কোনো দরকার নেই! এইটা নিয়েই তো অনেকে ভুল বোঝে আর পিছিয়ে পড়ে। বিশ্বাস করুন, আউটডোর লার্নিংয়ের জন্য আপনার বাড়ির পেছনের উঠান, ছাদবাগান, অথবা আপনার এলাকার যেকোনো পার্কই যথেষ্ট।
প্রথমত, বাড়িতেই শুরু করুন। আপনার সন্তানের সাথে বাড়ির উঠানে বা টবে গাছ লাগান। ওকে জল দিতে বলুন, গাছের বৃদ্ধি লক্ষ্য করতে শেখান। এটা ওর মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে আর প্রকৃতির প্রতি ওর আগ্রহ বাড়াবে। এমনকি, একটা ছোট্ট চিড়িয়াখানায় গিয়ে বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে ওকে হাতে-কলমে ধারণা দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, স্কুলগুলোতে শিক্ষকরাও দারুণ কিছু করতে পারেন। সপ্তাহে অন্তত একটা দিন ক্লাসটাকে বাইরে নিয়ে যান। স্কুলের মাঠে বা কাছাকাছি কোনো পার্কে গিয়ে গল্পের বই পড়ানো যেতে পারে। কিংবা, বিজ্ঞান ক্লাসের জন্য পোকামাকড় বা গাছের পাতা সংগ্রহ করতে বলা যেতে পারে, যা দিয়ে পরে ক্লাসে আলোচনা হবে। আমি তো দেখেছি, এই ধরনের ক্লাসে ছেলেমেয়েরা কত মনোযোগ দিয়ে শেখে!
তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। নদী, পুকুর, বা কোনো পাহাড়ি এলাকায় ওদেরকে নিয়ে যান। ওদেরকে প্রশ্ন করতে দিন, যেমন – এই গাছটা এত উঁচু কেন?
এই পাখিটা কেন ডাকে? দেখবেন, ওদের কৌতূহল ওদেরকেই নতুন কিছু শিখিয়ে দেবে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, বাচ্চাদের জন্য আউটডোর লার্নিং মানেই একটা অফুরন্ত আবিষ্কারের জগৎ। শুধু একটু সুযোগ করে দেওয়া আর ওদেরকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে দেওয়া—ব্যাস!
আর কিছু লাগে না। দেখবেন, ওরা নিজেরাই অনেক কিছু শিখে যাবে, যা ওদেরকে আরও আত্মনির্ভরশীল আর বুদ্ধিমান করে তুলবে।






